অনলাইন ডেস্ক::
স্থানীয় সরকার কাঠামোর সর্বনিম্ন স্তর ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন আগামী জুলাই মাস থেকে শুরু করার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। প্রথম ধাপে ২০৪টি ইউনিয়ন পরিষদে ভোট গ্রহণের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এসব ইউনিয়নের বেশির ভাগই বরিশাল বিভাগের ছয়টি জেলায় অবস্থিত।
সরকারি সূত্র বলছে, সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও পৌরসভা নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার পরপরই ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন শুরু করা হবে। দ্বিতীয় ধাপে ইউপি নির্বাচন এ বছরের শেষ দিকে আয়োজনের সম্ভাবনা রয়েছে।
মেয়াদোত্তীর্ণ ইউপিতে অগ্রাধিকার
স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন অনুযায়ী, নির্বাচিত পরিষদের প্রথম সভার পর পাঁচ বছর পূর্ণ হওয়ার ১৮০ দিনের মধ্যে পরবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে হবে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের ২১ জুন প্রথম ধাপে ২০৪টি ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেই মেয়াদ শেষ হওয়ায় এবার সেসব ইউনিয়নে নতুন নির্বাচন আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, “প্রথম ধাপে আমরা ওই ২০৪টি ইউনিয়নেই অগ্রাধিকার দিচ্ছি, যেখানে ২০২১ সালের জুনে নির্বাচন হয়েছিল এবং বর্তমানে মেয়াদোত্তীর্ণ।”
জনপ্রিয়তার সময়েই স্থানীয় নির্বাচন?
মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়লাভের পর সরকারের জনপ্রিয়তা থাকা অবস্থাতেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন সম্পন্ন করতে চায় সরকার।
স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছেন, যত দ্রুত সম্ভব স্থানীয় নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরু হবে। তবে তিনি বলেন, স্থানীয় নির্বাচন দলীয় প্রতীকে হবে কি না, সে বিষয়ে জাতীয় সংসদে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
আগামী ১২ মার্চ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হচ্ছে। সংসদে এ–সংক্রান্ত অধ্যাদেশ আইন আকারে পাস হবে কি না এবং দলীয় প্রতীকের বিধান বহাল থাকবে নাকি বাতিল হবে—সেটির ওপর নির্ভর করছে নির্বাচন কমিশন ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের পরবর্তী প্রস্তুতি।
ডিসিদের কাছে তথ্য চেয়েছে মন্ত্রণালয়
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি দেশের সব জেলা প্রশাসকের (ডিসি) কাছে চিঠি পাঠিয়েছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। তাতে প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদে বর্তমানে কারা দায়িত্ব পালন করছেন—তার বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয়েছে।
বিশেষ করে জানতে চাওয়া হয়েছে—
- কতটি ইউনিয়নে চেয়ারম্যান দায়িত্ব পালন করছেন
- কতটিতে প্যানেল চেয়ারম্যান দায়িত্বে আছেন
- কতটিতে প্রশাসক নিয়োগ রয়েছে
মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে ইউনিয়ন পরিষদের সংখ্যা ৪ হাজার ৫৮০টি।
অভ্যুত্থান–পরবর্তী বাস্তবতা
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বহু ইউপি চেয়ারম্যান আত্মগোপনে চলে যান। মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, প্রায় দেড় হাজার ইউনিয়নে চেয়ারম্যানরা অফিসে অনুপস্থিত ছিলেন; তাঁদের অনেকের বিরুদ্ধে মামলা হয়।
পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকার অনুপস্থিত চেয়ারম্যানদের স্থলে অনেক ইউনিয়নে প্রশাসক নিয়োগ দেয়। বর্তমানে কোথাও চেয়ারম্যান, কোথাও প্যানেল চেয়ারম্যান, আবার কোথাও প্রশাসক দায়িত্ব পালন করছেন। তবে সুনির্দিষ্ট হালনাগাদ তথ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে ছিল না। জাতীয় নির্বাচনের পর নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এখন ডিসিদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
পিরোজপুরের জেলা প্রশাসক আবু সাঈদ জানিয়েছেন, তাঁদের জেলায় প্রশাসক নিয়োগ–সংক্রান্ত তথ্য ইতিমধ্যে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। বরিশালের জেলা প্রশাসক খায়রুল আলম সুমন বলেন, তাঁর জেলায় কয়েকটি ইউনিয়ন প্রশাসক দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে, তবে সংখ্যায় কম।
দলীয় প্রতীকে নাকি নির্দলীয় নির্বাচন?
২০১৫ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার স্থানীয় সরকারের পাঁচটি স্তরে দলীয় পরিচয় ও প্রতীকে নির্বাচন চালু করতে আইন সংশোধন করে। তবে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদে দলীয় প্রতীকের বিধান বাতিল করে অধ্যাদেশ জারি করে।
এখন প্রশ্ন হলো—সংসদে এ অধ্যাদেশ আইন আকারে পাস হবে কি না এবং দলীয় প্রতীক বহাল থাকবে নাকি নির্দলীয় পদ্ধতিতে ভোট হবে।
অতীতের সহিংসতা ও সমালোচনা
বিগত স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে দলীয় প্রতীক ব্যবহারের কারণে সহিংসতা, প্রাণহানি ও মনোনয়ন–বাণিজ্যের অভিযোগ ওঠে। ভোটার উপস্থিতিও ছিল তুলনামূলক কম। প্রশাসক দিয়ে ইউনিয়ন পরিচালনার কারণে নাগরিক সেবা বিঘ্নিত হওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)–এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হওয়ায় দেশে বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। তাঁর মতে, দলীয় প্রতীকের কারণে সহিংসতা বেড়েছে এবং অনেক জনপ্রিয় ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি নির্বাচন থেকে দূরে সরে গেছেন।
তিনি বলেন, “দলীয় প্রতীকের কারণে মনোনয়ন–বাণিজ্য হয়েছে। অযোগ্য ব্যক্তিরা নির্বাচিত হয়েছেন। তাই স্থানীয় নির্বাচন নির্দলীয় হওয়া উচিত।”
সামনে কী?
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানিয়েছে, ২০২১ ও ২০২২ সালে ধাপে ধাপে যেসব ইউনিয়নে নির্বাচন হয়েছিল, সেগুলোর মেয়াদ অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে নতুন নির্বাচন আয়োজন করা হবে।
তবে নির্বাচন দলীয় প্রতীকে হবে, নাকি নির্দলীয়ভাবে—এ সিদ্ধান্তই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সংসদের আসন্ন অধিবেশন শেষে এ বিষয়ে স্পষ্টতা মিললে নির্বাচন কমিশন আনুষ্ঠানিক তফসিল ঘোষণার প্রস্তুতি নেবে।
স্থানীয় সরকার বিশ্লেষকদের মতে, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন দেশের তৃণমূল গণতন্ত্রের ভিত্তি শক্তিশালী করার অন্যতম প্রধান উপাদান। তাই সময়মতো, স্বচ্ছ ও সহিংসতামুক্ত নির্বাচন আয়োজনই হবে সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
