এম.এ.কে. রানা, মহেশখালী।
কক্সবাজারের দ্বীপ উপজেলা মহেশখালীর কুতুবজোম ইউনিয়নে মা ও ছেলের রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। নির্জন একটি বসতবাড়ি থেকে তাদের মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। ঘটনাটি আত্মহত্যা না কি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড এ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র প্রশ্ন ও সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
রবিবার (১১ জানুয়ারি) দুপুর আনুমানিক ১২টার দিকে কুতুবজোম ইউনিয়নের নয়াপাড়া–চান্দাকাটা এলাকার একটি নির্জন বসতবাড়ির কোণায় মা ও ছেলের মরদেহ পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয়রা পুলিশে খবর দেন। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ উদ্ধার করে।
নিহতরা হলেন নয়াপাড়া–চান্দাকাটা এলাকার আনচার উল্লাহর মেয়ে এবং কুতুবজোমের ঘটিভাংগা এলাকার রহিম উল্লাহর সাবেক স্ত্রী ইসমত আরা (৩০) ও তার পাঁচ বছর বয়সী ছেলে আবরার।
নিহতের পিতা আনচার উল্লাহ জানান, ইসলামী শরীয়াহ মোতাবেক রহিম উল্লাহর সঙ্গে ইসমত আরার বিয়ে হলেও মানসিক অসুস্থতার কারণে প্রায় ছয় বছর আগে তাদের বিবাহ বিচ্ছেদ হয়। এরপর থেকে ইসমত আরা বাবার বাড়িতেই বসবাস করছিলেন।
তিনি আরও জানান, ইসমত আরা দীর্ঘদিন ধরে মৃগী রোগে ভুগছিলেন। প্রায়ই খিঁচুনি হয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলতেন। একাধিক চিকিৎসা নেওয়া হলেও তার অবস্থার তেমন উন্নতি হয়নি।
আনচার উল্লাহ বলেন, “আজ হঠাৎ করে লোকজন এসে জানায় আমার মেয়ে ও নাতি মাটিতে পড়ে আছে। গিয়ে দেখি দুজনই মৃত। মেয়ের মাথায় গভীর আঘাতের চিহ্ন ছিল, মাথা রক্তে ভেজা।”
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বিচ্ছেদের আগে রহিম উল্লাহ ও ইসমত আরার সংসারে দুই ছেলে সন্তান ছিল। বাবার বাড়িতে থাকার সময় প্রায় পাঁচ বছর আগে পুকুরে পড়ে বড় ছেলের মৃত্যু হয়। এবার একই পরিবারের মা ও ছোট ছেলের মৃত্যুতে এলাকায় গভীর শোকের পাশাপাশি উদ্বেগ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
ঘটনাস্থলটি তুলনামূলকভাবে নির্জন। আশপাশে ঘনবসতি নেই এবং দুপুরের দিকে মানুষের চলাচলও কম থাকে। তবে কিছু দূরত্বে বসতঘর থাকলেও কেউ কোনো চিৎকার বা শব্দ শোনেনি বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। ঘটনার আলামত ঘিরেই মূলত আত্মহত্যার দাবি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ইসমত আরার মাথায় যে ধরনের গভীর আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে, তা ইট বা শক্ত কোনো বস্তু দিয়ে আঘাত করার মতো। অনেকের প্রশ্ন—এভাবে মাথায় আঘাত করে আত্মহত্যা করা কতটা বাস্তবসম্মত? আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, শিশুটির মরদেহ মায়ের পাশেই পাওয়া যায় এবং তার গলায় আঘাতের চিহ্ন ছিল। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, শিশুটিকে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করা হয়েছে।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, মানসিকভাবে অসুস্থ হলেও একজন মা কি নিজের সন্তানকে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করতে পারেন? এরপর নিজে এমনভাবে আত্মহত্যা করবেন, যার আলামত স্পষ্টভাবে আঘাতজনিত মৃত্যুর ইঙ্গিত দেয়?
ঘটনাস্থল ঘুরে দেখা একাধিক ব্যক্তি জানান, চোখে দেখা আলামত অনুযায়ী এটি আত্মহত্যা বলে মেনে নেওয়া কঠিন। তাদের মতে, পুরো ঘটনায় পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের লক্ষণ স্পষ্ট।
এ ঘটনায় নিরপেক্ষ ও গভীর তদন্তের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী। দ্রুত ময়নাতদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের আহ্বান জানান তারা।
মহেশখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মজিবুর রহমান বলেন, “স্থানীয়রা মা ও ছেলেকে মৃত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে পুলিশকে খবর দেয়। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করেছে। ময়নাতদন্তের জন্য কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। রিপোর্ট পাওয়ার পর মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে।”
