এম.এ.কে.রানা,মহেশখালী।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬ সামনে রেখে কক্সবাজার-২ (মহেশখালী–কুতুবদিয়া) আসনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে নির্বাচনী মাঠের মূল লড়াই। প্রতীক বরাদ্দের পর থেকেই প্রার্থীরা ভোটারদের কাছে যাচ্ছেন নানা প্রতিশ্রুতি আর অঙ্গীকার নিয়ে। তবে ভোটারদের প্রশ্ন এবার স্পষ্ট উন্নয়ন কার জন্য, আর সুফল পাচ্ছে কে?
বুধবার (২১ জানুয়ারি) কক্সবাজার জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা আবুল মান্নান আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থীদের মধ্যে নির্বাচনী প্রতীক বরাদ্দ দেন। এ আসনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও জোট থেকে মোট পাঁচজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন।
প্রতিদ্বন্দ্বি পাঁচজন প্রার্থীর মধ্যে বিএনপির প্রার্থী সাবেক সংসদ সদস্য আলমগীর মুহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ ফরিদ পেয়েছেন ধানের শীষ, জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কমিটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এএইচএম হামিদুর রহমান আজাদ পেয়েছেন দাঁড়িপাল্লা, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী জিয়াউল হক পেয়েছেন হাতপাখা, জাতীয় পার্টির প্রার্থী মো. মাহমুদুল করিম পেয়েছেন লাঙ্গল এবং গণঅধিকার পরিষদের (জিওপি) প্রার্থী এস এম রোকনুজ্জামান খান পেয়েছেন ট্রাক
প্রতীক।
এর আগে ২০ জানুয়ারি দশ দলীয় জোটের শরিক বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী ওবায়দুল কাদের নদভী প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে জামায়াত প্রার্থী হামিদুর রহমান আজাদের প্রতি সমর্থন ঘোষণা করেন। ফলে মাঠের সমীকরণ শুরুতেই কিছুটা পাল্টে গেছে। প্রতীক বরাদ্দের সঙ্গে সঙ্গেই মহেশখালী ও কুতুবদিয়ার গ্রাম, বাজার, পাড়া-মহল্লায় শুরু হয়েছে জোরালো গণসংযোগ। নির্বাচনী পোস্টার, মাইকিং আর উঠান বৈঠকে সরগরম হয়ে উঠছে দ্বীপাঞ্চলের রাজনীতি।
নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজার-২ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৮২ হাজার ২৭৯ জন। এর মধ্যে মহেশখালী উপজেলায় ভোটার ২ লাখ ৭৮ হাজার ৮৯৮ জন এবং কুতুবদিয়া উপজেলায় ১ লাখ ৩ হাজার ৩৮১ জন। নারী ভোটারের সংখ্যাও এখানে উল্লেখযোগ্য, যা নির্বাচনের ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ঐতিহাসিকভাবে এই আসনটি বরাবরই রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর ও পরিবর্তন প্রবণ।
স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা এখান থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। ১৯৮৬ সালে জাতীয় পার্টির জহিরুল ইসলাম, ১৯৯১ সালে মোহাম্মদ ইসহাক, ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপির এটিএম নুরুল বাশার চৌধুরী এবং একই বছরের জুনে পুনঃনির্বাচনে আলমগীর মাহফুজ উল্লাহ ফরিদ সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০১ সালেও বিজয়ী হন ফরিদ। ২০০৮ সালে বিএনপির জোটে এএইচএম হামিদুর রহমান আজাদ নির্বাচিত হন। এরপর ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪—টানা তিন মেয়াদে আওয়ামী লীগ মনোনীত আশেক উল্লাহ রফিক সংসদ সদস্য ছিলেন।
এবারের নির্বাচনের গুরুত্ব আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। কারণ এই আসনের ভৌগোলিক সীমানার মধ্যেই বাস্তবায়িত হচ্ছে দেশের অন্যতম বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্প মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্র বন্দর, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল। এসব প্রকল্পের কারণে কক্সবাজার-২ এখন জাতীয় অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের কৌশলগত কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্র বন্দর চালু হলে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো বড় জাহাজে সরাসরি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অংশ নিতে পারবে। এতে দেশের আমদানি-রপ্তানি খরচ কমবে এবং অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলবে। তবে এই উন্নয়ন নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে সন্তুষ্টির পাশাপাশি উদ্বেগও রয়েছে। ভূমি অধিগ্রহণে ক্ষতিগ্রস্ত বহু পরিবার এখনো ন্যায্য পুনর্বাসনের অপেক্ষায়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মেগা প্রকল্পে বাইরের লোকের কর্মসংস্থান হলেও দ্বীপের মানুষের জন্য কাজের সুযোগ সীমিত। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কারণে কোহলিয়া নদীর নাব্যতা কমে যাওয়ার পাশাপাশি জেলেদের জীবিকায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। পরিবেশ দূষণ ও কৃষিজমি ক্ষতির আশঙ্কাও বাড়ছে। এ কারণেই এবারের নির্বাচনে ভোটারদের প্রত্যাশা কেবল স্লোগান নির্ভর নয়, বাস্তব ভিত্তিক।
ভোটাররা চাইছেন—ইকোনমিক জোন ও শিল্প প্রকল্পে স্থানীয়দের অগ্রাধিকারভিত্তিক চাকরি, ভূমি অধিগ্রহণে ন্যায্য ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন, পরিবেশবান্ধব শিল্পায়ন, দ্বীপাঞ্চলের টেকসই সড়ক ও নৌ যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং জেলে ও কৃষকদের জীবন-জীবিকা সুরক্ষা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কক্সবাজার-২ আসনে এবারের নির্বাচন শুধু দলীয় শক্তির পরীক্ষা নয়; এটি উন্নয়ন বনাম জনস্বার্থ রক্ষার একটি বড় মাপকাঠি। সংসদে কে যাবেন, তার ওপর নির্ভর করবে মহেশখালী ও কুতুবদিয়া কেবল জাতীয় প্রকল্পের বোঝা বইবে, নাকি উন্নয়নের সুফলভোগী একটি সমৃদ্ধ দ্বীপাঞ্চল হিসেবে গড়ে উঠবে।
প্রতীক বরাদ্দ সম্পন্ন হওয়ায় কক্সবাজার-২ আসনে হাড্ডাহাড্ডি নির্বাচনী লড়াইয়ের আভাস এখন স্পষ্ট। ভোটের মাঠে শেষ পর্যন্ত কার বার্তা ভোটারের মন ছুঁতে পারে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
