Saturday, 18 April, 2026

এম.এ.কে.রানা,মহেশখালী।
দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের কৌশলগত কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠা কক্সবাজারের মহেশখালী ও মাতারবাড়ি অঞ্চলের মেগা প্রকল্পসমূহ সরেজমিনে পরিদর্শনে দুই দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে এসেছেন সরকারের শীর্ষ দুই নীতিনির্ধারক। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ এবং প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত শুক্রবার সফর শুরু করেন।

সরকারি সফরসূচি অনুযায়ী, শুক্রবার সকালে তারা আকাশপথে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে পৌঁছান। পরে সেখান থেকে বিশেষ দ্রুতগামী নৌযানে বঙ্গোপসাগরের গভীর সমুদ্রে স্থাপিত ভাসমান গ্যাস টার্মিনাল (এফএসআরইউ) পরিদর্শনে যান। এ সময় এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত টার্মিনালে অবস্থান করে মন্ত্রীদ্বয় তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি, সংরক্ষণ, পুনঃগ্যাসীকরণ এবং জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের পুরো প্রক্রিয়া সরাসরি পর্যবেক্ষণ করেন। সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা টার্মিনালের দৈনিক গ্যাস সরবরাহ সক্ষমতা, অপারেশনাল নিরাপত্তা ব্যবস্থা, আবহাওয়া-নির্ভর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে করণীয় বিষয়ে বিস্তারিত ব্রিফিং দেন।

জানা গেছে, এই ভাসমান টার্মিনাল দেশের গ্যাস সংকট মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে এবং জাতীয় গ্রিডে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ গ্যাস সরবরাহ করছে।

বিকেলে মন্ত্রীদ্বয় মহেশখালীর মাতারবাড়িতে পৌঁছে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিদর্শন করেন। প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নির্মাণ অগ্রগতি, উৎপাদন সক্ষমতা, কয়লা আমদানি ব্যবস্থা, গভীর সমুদ্রবন্দর সুবিধা এবং পরিবেশ সুরক্ষামূলক প্রযুক্তি সম্পর্কে বিস্তারিত উপস্থাপনা দেন।

এছাড়া প্রস্তাবিত স্থলভিত্তিক এলএনজি ও এলপিজি টার্মিনাল এলাকা ঘুরে দেখেন তারা। কর্মকর্তারা জানান, এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বৈচিত্র্য আসবে এবং আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থাপনা আরও সুসংহত হবে।

দিনশেষে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী মাতারবাড়ি কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পের অতিথি ভবনে রাত্রিযাপন করেন এবং সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে প্রকল্পের চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেন।

সফরের দ্বিতীয় দিন আগামীকাল শনিবার সকালে তারা মাতারবাড়ি থেকে সড়কপথে মহেশখালীর সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) প্রকল্পের ট্যাংক ফার্ম পরিদর্শনে যাবেন। এই প্রকল্পের মাধ্যমে গভীর সমুদ্র থেকে সরাসরি জ্বালানি তেল খালাস করে পাইপলাইনের মাধ্যমে সংরক্ষণাগারে পৌঁছানোর সুবিধা তৈরি হচ্ছে। এতে সময়, খরচ এবং জাহাজ জট কমবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। মন্ত্রীদ্বয় সেখানে তেল সংরক্ষণ সক্ষমতা, পাম্পিং স্টেশন, পাইপলাইন সংযোগ এবং অপারেশনাল নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করবেন। পরবর্তীতে তারা গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেডের (জিটিসিএল) নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি কেন্দ্র পরিদর্শন করবেন, যেখানে জাতীয় গ্যাস সঞ্চালন ব্যবস্থার রিয়েল-টাইম মনিটরিং কার্যক্রম সম্পর্কে ধারণা নেওয়া হবে।

মন্ত্রীদের সফরকে ঘিরে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জুড়ে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। জেলা প্রশাসন, পুলিশ, কোস্ট গার্ড এবং বিআইডব্লিউটিএ যৌথভাবে সমন্বয় করে সফরের প্রতিটি পর্যায়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে। এ সফরে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব, পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যানসহ উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধি দল অংশ নিয়েছেন।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, মহেশখালী-মাতারবাড়ি অঞ্চল ইতোমধ্যে দেশের বৃহত্তম ‘এনার্জি হাব’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। এলএনজি টার্মিনাল, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, এসপিএম প্রকল্প এবং ভবিষ্যৎ জ্বালানি অবকাঠামো সব মিলিয়ে এই অঞ্চল দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, মন্ত্রীদের এই উচ্চপর্যায়ের সরেজমিন পরিদর্শন শুধু চলমান প্রকল্পের অগ্রগতি যাচাই নয়, বরং ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ, নীতিনির্ধারণ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের প্রত্যাশা, এ ধরনের উচ্চপর্যায়ের নজরদারির ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি আরও বাড়বে এবং মহেশখালী-মাতারবাড়ি এলাকার অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও জনজীবনের মানোন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version