Sunday, 13 September, 2026

এম.এ.কে. রানা, মহেশখালী◾
টানা কয়েক দিনের ভারী ও মাঝারি বৃষ্টিতে কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়ী ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল ভয়াবহ জলাবদ্ধতার কবলে পড়েছে। বসতবাড়ি, দোকানপাট, গ্রামীণ সড়ক ও কৃষিজমি পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। অনেক এলাকায় ঘরের ভেতরে ২ থেকে ৩ ফুট পর্যন্ত পানি ঢুকে পড়ায় পরিবারগুলো নিরাপদ আশ্রয়ের সংকটে পড়েছে। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন শিশু, নারী, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিরা।

◾বসতবাড়ি ও সড়কে হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি, তলিয়ে গেছে আমনের জমি

স্থানীয়দের অভিযোগ, শনিবার (৪ জুলাই) থেকে টানা তিন দিনের ভারী ও মাঝারি বর্ষণের পর পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটে। বৃষ্টির পানি নামার স্বাভাবিক পথ না থাকায় অল্প সময়েই বিভিন্ন গ্রাম প্লাবিত হয়। অনেক পরিবার ঘর থেকে বের হতে পারছেন না। কোথাও কোথাও নৌকা ব্যবহার করে চলাচল করতে হচ্ছে। পানির নিচে তলিয়ে গেছে অসংখ্য গ্রামীণ সড়ক, ফলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বাজার ও প্রয়োজনীয় সেবাকেন্দ্রে যাতায়াত মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

প্লাবিত এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে সিকদার পাড়ার পূর্বপাড়া, বানিয়াকাটা, ওয়াপদা পাড়া, বান্ডি সিকদার পাড়া, উত্তর-পূর্ব সিকদার পাড়া, নতুন বাজারের পুরাতন কাজী অফিস সংলগ্ন সড়ক, পুরাতন সিএনজি স্টেশন এলাকা, পুরান বাজার, বাংলা বাজার, উত্তর রাজঘাট, দক্ষিণ রাজঘাট বিলপাড়া, কচুতলা, টেকপাড়া, নয়া পাড়া, সাইট পাড়া, পশ্চিম তিতা মাঝির পাড়া, পূর্ব তিতা মাঝির পাড়া, মাঝের ডেইল, মিয়াজীর পাড়া, বলির পাড়া, হংস মিয়াজীর পাড়ার হেডপাড়া, সর্দ্দার পাড়া, সাইরার ডেইল, পূর্ব মগডেইল, পূর্ব মাইজপাড়া, ফুলজান মোড়া, সাইরার ডেইল বিলপাড়াসহ ইউনিয়নের আরও অনেক নিম্নাঞ্চল।

এদিকে জলাবদ্ধতার কারণে প্রায় ৩০ হেক্টর আমন আবাদি জমি পানির নিচে তলিয়ে গেছে। অনেক কৃষক ইতোমধ্যে বীজতলা ও রোপণ করা ধানের চারা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা করছেন। দীর্ঘদিন পানি জমে থাকলে চলতি মৌসুমে ব্যাপক কৃষি ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। এতে কৃষকদের স্বপ্ন ও বিনিয়োগ একসঙ্গে পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন স্থানীয়রা।

ভুক্তভোগীদের দাবি, পানি চলাচলের খাল-নালা দখল, অপরিকল্পিতভাবে বাড়িঘর নির্মাণ, সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে পর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা না রাখা এবং মাছের প্রজেক্ট নির্মাণের কারণে প্রাকৃতিক পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ফলে বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশন না হয়ে লোকালয়ে জমে ভয়াবহ জলাবদ্ধতার সৃষ্টি করছে। তারা দ্রুত খাল-নালা পুনঃখনন, অবৈধ দখল উচ্ছেদ এবং স্থায়ী পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছেন।

৯ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মোহাম্মদ আলী বলেন, “আমার নির্বাচনী এলাকার সাইরার ডেইল, সর্দ্দার পাড়া, জালিয়া পাড়া ও বাহির পাড়ায় ভারী বৃষ্টির কারণে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। অনেক পরিবার পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। বিষয়টি আমি স্থানীয় সংসদ সদস্য এবং মহেশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) অবহিত করেছি। ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা ও দ্রুত জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য অনুরোধ জানিয়েছি।”

৮ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য নুরুল আবচার বলেন, “ভারী বর্ষণে আমার এলাকার বহু পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। অনেক বসতবাড়ি ও চলাচলের রাস্তা পানির নিচে তলিয়ে গেছে। ধানের জমিরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। আমি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো পরিদর্শন করেছি। বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।”

মাতারবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান মিজবাহ উদ্দীন মজিদী বলেন, “টানা ভারী বর্ষণে ইউনিয়নের বিভিন্ন নিম্নাঞ্চলে ভয়াবহ জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। অনেক পরিবার পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। বসতবাড়ি, গ্রামীণ সড়ক ও কৃষিজমির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়াতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি উদ্যোগ প্রয়োজন।”

মাতারবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এস.এম. আবু হায়দার বলেন, “ইউনিয়নের প্রতিটি ওয়ার্ডেই কমবেশি মানুষ পানিবন্দি হয়েছেন। এর মধ্যে অন্তত ৪ থেকে ৫টি গ্রামে পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ। হাজার হাজার পরিবার দুর্ভোগে রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়াতে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা চলছে।”

মহেশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইমরান মাহমুদ ডালিম বলেন, “টানা বৃষ্টিপাতের কারণে মহেশখালীতে কয়েকটি ইউনিয়নে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে বলে আমরা জানতে পেরেছি। প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোথাও জরুরি সহায়তার প্রয়োজন হলে তা দ্রুত পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি পানি নিষ্কাশনের বিষয়েও সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করা হবে।”

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, প্রতিবছর বর্ষা এলেই একই চিত্রের পুনরাবৃত্তি ঘটে। স্থায়ীভাবে জলাবদ্ধতা নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়ায় বছরের পর বছর ধরে তারা দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। তারা দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা গ্রহণ, খাল-নালা পুনঃখনন এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধানের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version