এম.এ.কে.রানা◾
আসন্ন মাতারবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যেই বইতে শুরু করেছে নির্বাচনী হাওয়া। চায়ের দোকান থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সবখানেই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু, ‘কে হচ্ছেন মাতারবাড়ী ইউনিয়নের পরবর্তী চেয়ারম্যান?’ বিশেষ করে বিএনপির সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থীদের নিয়ে চলছে ব্যাপক আলোচনা।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ধানের শীষের মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত নামগুলোর একটি মাতারবাড়ী ইউনিয়ন বিএনপির সদস্য সচিব মো. হোসাইন মাসুম। দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ছাত্রদল, যুবদল ও বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত তিনি বর্তমানে ইউনিয়ন বিএনপির সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। রাজনৈতিক পরিচয়ের পাশাপাশি সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডেও তিনি স্থানীয়দের কাছে পরিচিত। শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে সহযোগিতা, দুর্যোগকালে ত্রাণ বিতরণ এবং অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কারণে তিনি ভোটারদের আলোচনায় রয়েছেন।
সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকায় রয়েছেন তরুণ সমাজসেবক ও ব্যবসায়ী ইঞ্জিনিয়ার আলী ছিদ্দিক আপন চৌধুরী। তিনি মরহুম ছিদ্দিক আহমদ চৌধুরীর নাতি। স্থানীয় বিএনপির রাজনীতিতে মরহুম ছিদ্দিক আহমদ চৌধুরীর অবদান উল্লেখযোগ্য বলে নেতাকর্মীরা মনে করেন। রাজনৈতিক পরিবারের উত্তরসূরি হিসেবে আপন চৌধুরী কয়েক বছর ধরে অসহায় পরিবারের মাঝে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ, শিক্ষার্থী ও অসচ্ছল রোগীদের আর্থিক সহায়তাসহ বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় রয়েছেন। ইতোমধ্যে তিনি নির্বাচনী প্রচারণাও জোরদার করেছেন।
আলোচনায় রয়েছেন মাতারবাড়ী ইউনিয়ন বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও মাতারবাড়ী আইডিয়াল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মাস্টার সাখাওয়াত হোছাইন। তিনি সাবেক চেয়ারম্যান মরহুম মোস্তাক আহমদ চৌধুরীর ভাতিজা এবং সাবেক উপজেলা মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান শামীম আরা দুলারীর পরিবারের সদস্য। শিক্ষা, সামাজিক উন্নয়ন, ধর্মীয় কার্যক্রম এবং সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে দীর্ঘদিনের সম্পৃক্ততার কারণে তিনি এলাকায় একটি গ্রহণযোগ্য মুখ হিসেবে পরিচিত।
তরুণ প্রজন্মের আলোচনায় রয়েছেন মহেশখালী উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক ও ব্যবসায়ী মামুনুল ইসলাম মামুন। দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা ও সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত থাকায় এবং পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির কারণে তিনিও সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন।
এ ছাড়া ২০১৬ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ধানের শীষের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা নাসির উদ্দীন মোহাম্মদ বাবর চৌধুরীও এবার সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন। ওই নির্বাচনে তিনি প্রায় ৬ হাজার ৪০০ ভোট পেয়েছিলেন এবং অল্প ব্যবধানে পরাজিত হন। ইতোমধ্যে তিনি প্রার্থিতা ঘোষণা করে সমর্থন আদায়ে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।
আলোচনায় রয়েছেন মাতারবাড়ী ইউনিয়ন যুবদলের সাধারণ সম্পাদক রফিক উদ্দীন মানিক। বিভিন্ন শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত এই নেতাও দীর্ঘদিন ধরে সাংগঠনিক কার্যক্রমের পাশাপাশি নীরবে নির্বাচনী প্রস্তুতি নিচ্ছেন। স্থানীয়দের মতে, বৃহত্তর রাজঘাট এলাকার সমর্থন পেলে তিনিও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।
সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে আরও রয়েছেন মহেশখালী উপজেলা কৃষক দলের সাবেক আহ্বায়ক এইচ এম জসিম উদ্দিন। রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান হিসেবে এলাকায় তাঁরও উল্লেখযোগ্য কর্মী-সমর্থক রয়েছে। তিনি ইতোমধ্যে প্রকাশ্যে নির্বাচনী প্রস্তুতি শুরু করেছেন।
এ ছাড়া মহেশখালী উপজেলা বিএনপির প্রবাসী কল্যাণ সম্পাদক ও মক্কা প্রাদেশিক বিএনপির সদস্য সচিব মুহাম্মদ সাহাবও চেয়ারম্যান পদে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে কাজ করে যাচ্ছেন। ইতোমধ্যে তিনি প্রার্থিতার ঘোষণা দিয়ে জনসমর্থন আদায়ে বিভিন্ন এলাকায় গণসংযোগ করছেন।
অপর দিকে আনুষ্ঠানিক ভাবে ঘোষণা দিয়ে নির্বাচনীয় মাঠ চছে বেড়াচ্ছেন বিশিষ্ট সমাজসেবক ভেন্ডার রফিকুল ইসলাম। ভেন্ডার হওয়ার সুবাদের তার রয়েছে চেনা পরিচিত মুখ। বিভিন্ন পেশার মানুষের সঙ্গে তার ওঠাবসা রয়েছে। তিনি এলাকার পরিচিত মুখ। তার রয়েছে গুষ্টিগত বিশাল ভোট ব্যাংক। বিশাল ভোট ব্যাংক নিয়ে তিনি নির্বাচনী মাঠে চমক দেখাতে পারেন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
অন্যদিকে মাতারবাড়ী ইউনিয়ন বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও সাবেক ইউপি সদস্য হামেদ হোছাইন খোকার নামও সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকায় রয়েছে। তবে তিনি চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করবেন কি না, সে বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেননি।
স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মাতারবাড়ী ইউনিয়নে বিএনপির একাধিক শক্তিশালী ও গ্রহণযোগ্য মুখ চেয়ারম্যান পদে আগ্রহ প্রকাশ করায় নির্বাচন ঘিরে আগাম প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত দলীয় মনোনয়ন কার ভাগ্যে জুটবে এবং কারা নির্বাচনের মাঠে থাকবেন, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয়। রাজনৈতিক সমীকরণ, দলীয় সিদ্ধান্ত এবং ভোটারদের সমর্থনের ওপরই নির্ভর করবে আগামী দিনের মাতারবাড়ী ইউনিয়নের নেতৃত্ব।
তবে এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীক ছাড়া অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও বিএনপি অভ্যন্তরীণ সমঝোতার ভিত্তিতে প্রতিটি ইউনিয়নে একক প্রার্থী দেওয়ার কৌশল নিয়ে এগোচ্ছে।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, গত জাতীয় নির্বাচনে বিভিন্ন আসনে বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ায় তৃণমূলে যে বিভক্তি ও কোন্দলের সৃষ্টি হয়েছিল, সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়েই এবার দল ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচনে অংশ নিতে চায়।
দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক না থাকলেও একটি ইউনিয়নে একাধিক প্রার্থীর পরিবর্তে সমঝোতার মাধ্যমে একক প্রার্থী নির্ধারণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। একই সঙ্গে মনোনীত প্রার্থীর পক্ষে দলীয় নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
এদিকে তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত ঝুলে থাকা সাংগঠনিক কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন, বিতর্কিত ব্যক্তি বা অন্য দল থেকে অনুপ্রবেশকারীদের কমিটিতে স্থান না দেওয়া এবং মাঠপর্যায়ে তুলনামূলক তরুণ, সক্রিয় ও ত্যাগী নেতাদের নেতৃত্বে নিয়ে আসার বিষয়ে দায়িত্বশীল নেতাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলেও বৈঠক-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এমন প্রেক্ষাপটে মাতারবাড়ী ইউনিয়নেও বিএনপির সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থীদের মধ্যে কে শেষ পর্যন্ত দলের সমর্থন বা সমঝোতার ভিত্তিতে একক প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনী মাঠে থাকবেন, তা নিয়ে নেতাকর্মী ও সাধারণ ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের ধারণা, দলীয় ঐক্য বজায় রেখে প্রার্থী চূড়ান্ত করা গেলে নির্বাচনের সমীকরণেও বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।

