অনলাইন ডেস্ক::
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে জোটভিত্তিক রাজনীতি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে ন্যাশনাল সিভিক পার্টি (এনসিপি) গঠিত জোটের আসন ভাগাভাগি নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে জটিলতা ও কৌতূহল। শুরুতে উষ্ণ সম্পর্কের ইঙ্গিত মিললেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই সমঝোতা যে কঠিন বাস্তবতার মুখে পড়েছে, তা ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে।
রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রচলিত একটি বাস্তবতা হলো—জোট গঠন তুলনামূলক সহজ হলেও আসন বণ্টন অত্যন্ত সংবেদনশীল ও জটিল প্রক্রিয়া। জামায়াত–এনসিপি জোটেও সেই চিত্রই ফুটে উঠছে। এনসিপির দলীয় সূত্র জানায়, জোট গঠনের প্রাথমিক পর্যায়ে অন্তত ৩০টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিষয়ে মৌখিকভাবে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছিল। তবে সময়ের ব্যবধানে সেই সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে।
বর্তমানে জামায়াতের নীতিনির্ধারণী মহল থেকে সর্বোচ্চ ১০টি আসনের বেশি ছাড় দেওয়া হবে না—এমন ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। এই অবস্থান এনসিপির অভ্যন্তরে অস্বস্তি তৈরি করেছে। কারণ, দলটির একাধিক পরিচিত ও সক্রিয় নেতা নিজ নিজ এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে সাংগঠনিক কাজ ও জনসমর্থন তৈরি করেছেন। আসন সংখ্যা ১০-এর নিচে নামলে তাদের বড় অংশই প্রতিযোগিতার বাইরে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন, যা দলীয় সংহতির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
জামায়াতের অবস্থান তুলনামূলকভাবে কঠোর ও হিসাবনির্ভর। দলটি আবেগের বদলে জয়ী হওয়ার বাস্তব সম্ভাবনাকেই প্রধান মানদণ্ড হিসেবে দেখছে। জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য মোবারক হোসাইন জানিয়েছেন, দলীয় সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত এবং প্রয়োজনে নিজ দলের প্রার্থী প্রত্যাহার করেও জোট প্রার্থীকে বিজয়ী করতে তারা প্রস্তুত। তবে কোন আসনে ছাড় দেওয়া হবে, তা নির্ধারণের ক্ষেত্রে জনপ্রিয়তা, সাংগঠনিক শক্তি ও ভোটের হিসাবকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
তার মতে, যেসব আসনে জামায়াতের শক্ত অবস্থান রয়েছে, সেখানে সহজে আসন ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। জোটের স্বার্থে ছাড় দেওয়া হবে ঠিকই, তবে তা যুক্তিসংগত হতে হবে।
অন্যদিকে এনসিপির নেতৃত্ব এখনো প্রকাশ্যে আশাবাদী অবস্থান বজায় রাখছে। দলের যুগ্ম আহ্বায়ক সরোয়ার তুষার কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা উল্লেখ না করে বলেন, সমঝোতার প্রক্রিয়া এখনো চলমান। কিছু কিছু আসনে অনানুষ্ঠানিক সমঝোতা ইতোমধ্যে হয়েছে এবং উভয় দলের কর্মীরা মাঠপর্যায়ে সমন্বিতভাবে কাজ শুরু করেছেন বলেও তিনি দাবি করেন। তার ভাষায়, আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এলে বিভ্রান্তির অবসান ঘটবে এবং শেষ পর্যন্ত উভয় দলই একটি অভিন্ন প্রতীকের অধীনে নির্বাচনে অংশ নেবে।
৩০টি আসনের প্রত্যাশা থেকে ১০-এর কাছাকাছি নেমে আসা বড় কোনো ফাটলের ইঙ্গিত কি না—এই প্রশ্নে জামায়াত নেতৃত্ব তা নাকচ করেছে। তাদের মতে, মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিনই হবে প্রকৃত পরীক্ষা। ওই দিনই স্পষ্ট হবে কোন আসনে কে থাকছেন এবং কে সরে যাচ্ছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই টানাপোড়েনের পেছনে দুই দলের ভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক ভিত্তিও ভূমিকা রাখছে। এনসিপি মূলত তরুণ সমাজ ও নাগরিক মধ্যবিত্ত শ্রেণির একটি অংশকে প্রতিনিধিত্ব করে, অন্যদিকে জামায়াতের রয়েছে শক্তিশালী ও বিস্তৃত সাংগঠনিক কাঠামো। এই দুই শক্তির সমন্বয় ঘটাতে গিয়েই দরকষাকষি দীর্ঘায়িত হচ্ছে।
বর্তমানে দুই দলের নীতিনির্ধারকরা রুদ্ধদ্বার বৈঠকের মাধ্যমে সমাধানের পথ খুঁজছেন। মনোনয়ন যাচাই-বাছাই শেষ হওয়ার পর প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিনেই চূড়ান্ত চিত্র স্পষ্ট হবে—কারা থাকছেন ‘শাপলা কলি’ প্রতীকে, আর কারা লড়বেন ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীকের শক্তিতে ভর করে।
সব মিলিয়ে, এনসিপির ৩০ আসনের প্রাথমিক দাবি এবং জামায়াতের ১০-এর আশপাশে সীমাবদ্ধ রাখার প্রবণতার মধ্যকার ব্যবধানই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ। এই ব্যবধান কতটা কমানো যায়, তার ওপরই নির্ভর করছে জোটের ভবিষ্যৎ কার্যকারিতা। ঐক্য বজায় রাখা গেলে জামায়াত–এনসিপি জোট এবারের নির্বাচনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে পারে—না হলে আসন সমঝোতার জটই তাদের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

