এম.এ.কে. রানা, মহেশখালী।
বিদেশ থেকে এক লাখ মেট্রিক টন লবণ আমদানির খবরে কক্সবাজারের মহেশখালীসহ উপকূলীয় অঞ্চলের হাজার হাজার লবণ চাষি ও শ্রমিকের মধ্যে চরম হতাশা ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। চাষিদের অভিযোগ, লবণ মিল মালিকদের একটি অংশ ও সংশ্লিষ্ট আমলাদের কারসাজিতেই এই আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা সরাসরি দেশীয় লবণ শিল্পকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
লবণ আমদানির প্রতিবাদে মহেশখালী, কুতুবদিয়া, চকরিয়া, ইদগাহ এবং কক্সবাজার জেলা শহরে বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। আন্দোলনকারীরা অবিলম্বে আমদানির সিদ্ধান্ত বাতিল করে দেশীয় লবণ শিল্প রক্ষার দাবি জানান।
চাষিদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, মাঠ পর্যায়ে প্রকৃত লবণ মজুদের কোনো যাচাই না করেই একতরফাভাবে আমদানির সিদ্ধান্ত বহাল রাখা হয়েছে। শিল্প মন্ত্রণালয়ে এ বিষয়ে আবেদন করা হলেও বাস্তব তথ্য উপেক্ষা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন আবেদনকারীরা।
গত বছর শিল্প লবণের নামে বন্ড সুবিধায় বিপুল পরিমাণ লবণ আমদানি করে তা বিভিন্ন লবণ মিলে বিক্রি করা হয়। এর ফলে সারা বছর লবণের বাজারমূল্য অস্বাভাবিকভাবে কমে যায়। অনেক চাষি পানির দামে লবণ বিক্রি করতে বাধ্য হন, যার কারণে দেশীয় লবণ শিল্প মারাত্মক হুমকিতে পড়ে।

সূত্র জানায়, বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণের বাইরে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)-এর অনুমোদনে শিল্প আইআরসি ও বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধায় বিপুল পরিমাণ সালফেট জাতীয় লবণ আমদানি করা হচ্ছে। ২০২৩–২৪ অর্থবছরে ৫.৭০ লাখ মেট্রিক টন ডাইসোডিয়াম সালফেট এবং ০.১৫ লাখ মেট্রিক টন সোডিয়াম সালফেট আমদানি করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
এছাড়া বিডার সুপারিশে একই অর্থবছরে ৫.১৫ লাখ মেট্রিক টন সোডিয়াম ক্লোরাইড লবণ আমদানির তথ্য পাওয়া গেছে। কস্টিক সোডা ও ক্লোরিন উৎপাদনের কাঁচামাল হিসেবে তাসনিম কেমিক্যাল কমপ্লেক্স লিমিটেড অতিরিক্ত ১,১৭,৪৪০ মেট্রিক টন লবণ আমদানি করেছে বলেও এনবিআরের সূত্রে জানা যায়।
চাষিদের অভিযোগ, ডাইসোডিয়াম সালফেট ও সোডিয়াম সালফেট দেখতে সাধারণ লবণের মতো হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে সোডিয়াম ক্লোরাইড আমদানির সুযোগ নেওয়া হচ্ছে। বন্ড ও শিল্প আইআরসি সুবিধার অপব্যবহার করে এইচএস কোড ২৫০১.০০.২০-এর আওতায় আমদানিকৃত লবণ বিভিন্ন লবণ মিলে বিক্রি করা হচ্ছে, যা দেশীয় লবণ শিল্পকে সর্বনাশের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
অন্যদিকে, যেসব শিল্পে আগে দেশীয় লবণ ব্যবহৃত হতো, সেখানে এখন তুলনামূলক কম দামের আমদানিকৃত সালফেট জাতীয় লবণ ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে। ফলে শিল্প খাতে দেশীয় লবণের চাহিদা কমে যাচ্ছে এবং চাষিরা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
লবণ চাষি ও সংশ্লিষ্টরা সালফেট জাতীয় লবণের আমদানি শুল্ক পুনর্নির্ধারণ, সোডিয়াম সালফেটের নামে সোডিয়াম ক্লোরাইড আমদানি বন্ধ, খালাসের আগে যথাযথ পরীক্ষার দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি আমদানি নীতি ২০২১–২৪ এবং জাতীয় লবণ নীতি ২০২২-এর নির্দেশনা কঠোরভাবে বাস্তবায়নের আহ্বান জানান তারা।
কক্সবাজার ও মহেশখালীসহ উপকূলীয় অঞ্চলে লবণ উৎপাদনের সঙ্গে সরাসরি জড়িত প্রায় ৫ লাখ মানুষ এবং পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল প্রায় ২৫ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকার কথা বিবেচনায় নিয়ে মাঠ পর্যায়ের যাচাই ছাড়া গৃহীত এক লাখ মেট্রিক টন লবণ আমদানির সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার জন্য সরকারের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।


