মহেশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যোগ দিলেন ৭ নতুন চিকিৎসক
এম.এ.কে.রানা, মহেশখালী
কক্সবাজার জেলার দ্বীপ উপজেলা মহেশখালীতে স্বাস্থ্যসেবায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী অগ্রগতি ঘটেছে। দীর্ঘদিন ধরে চলমান চিকিৎসক সংকট কাটিয়ে উঠতে ৪৮তম বিসিএসের মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত ৭ জন তরুণ চিকিৎসক একযোগে মহেশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স-এ যোগদান করেছেন। এর ফলে উপজেলার প্রায় চার লাখ মানুষের জন্য প্রাথমিক ও জরুরি চিকিৎসাসেবায় নতুন গতি সঞ্চার হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মহেশখালী একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা হওয়ায় এখানকার মানুষের চিকিৎসাসেবায় বরাবরই সীমাবদ্ধতা ছিল। পর্যাপ্ত চিকিৎসক না থাকায় অনেক সময় রোগীদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়েই জেলা সদর কক্সবাজার কিংবা চট্টগ্রামে রেফার করতে হতো। নতুন চিকিৎসকদের যোগদানের ফলে হাসপাতালের আউটডোর, ইনডোর, জরুরি বিভাগ ও মাতৃসেবা কার্যক্রমে জনবল শক্তিশালী হলো, যা সরাসরি সেবার মান বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখবে।
নতুন যোগদানকারী সাত চিকিৎসকের মধ্যে পাঁচজনই মহেশখালী উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের বাসিন্দা। তাঁরা হলেন—ছোট মহেশখালী, মাতারবাড়ী, কালারমারছড়া ও হোয়ানক এলাকার সন্তান। নিজ এলাকার মানুষকে নিজ ভূখণ্ডে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার সুযোগ পাওয়ায় তাঁরা বিশেষভাবে উৎসাহী বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয়দের বিশ্বাস, এলাকার সামাজিক বাস্তবতা, যোগাযোগ সমস্যা ও অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে জানা চিকিৎসকরা রোগীদের প্রতি আরও সহানুভূতিশীল ও দায়বদ্ধ হবেন।
নতুন চিকিৎসক যোগদানের আগেই হাসপাতালে সিজারিয়ান অপারেশন ও জেনারেল সার্জারি সেবা চালু হয়েছে, যা মহেশখালীর স্বাস্থ্যখাতে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আগে প্রসূতি মায়েদের জটিলতা দেখা দিলে নৌপথ ও সড়কপথে জেলা সদরে নিতে গিয়ে অনেক সময় ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো। এখন সেই সেবা নিজ হাসপাতালেই পাওয়ায় মাতৃ ও নবজাতকের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
নতুন যোগদানকারী চিকিৎসকরা হলেন— ডা. আরমান কাদের (মাতারবাড়ী), ডা. শাহরিয়ার চৌধুরী রিফাত (বাঁশখালী), ডা. আবু জর গিফারী (পেকুয়া), ডা. রোকন উদ্দিন (ছোট মহেশখালী), ডা. আরিফুল ইসলাম (কালারমারছড়া), ডা. এ আর এম ফয়জান কিবরিয়া (হোয়ানক), ডা. উম্মে সিজরাতুন তানবিন (হোয়ানক)।
এই নিয়োগের ফলে বর্তমানে হাসপাতালে কর্মরত মহিলা চিকিৎসকের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে তিনজনে, যা নারী রোগীদের চিকিৎসাসেবায় স্বস্তি ও নিরাপত্তা বাড়াবে।
এ বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মাহাফুজুল হক জানান, নবযোগদানকারী সবাই মেডিকেল অফিসার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন এবং একইসঙ্গে উচ্চতর প্রশিক্ষণ কোর্সে অধ্যয়নরত। তিনি বলেন, “এই তরুণ চিকিৎসকরা অত্যন্ত মেধাবী ও উদ্যমী। তাঁদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় হাসপাতালের চিকিৎসাসেবার মান আরও উন্নত হবে। আমরা চাই, দ্বীপাঞ্চলের মানুষ যেন সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর আস্থা রাখতে পারে।”
তিনি আরও জানান, হাসপাতালের অবকাঠামো উন্নয়ন, আধুনিক অপারেশন থিয়েটার, নতুন যন্ত্রপাতি সংযোজন ও শয্যা ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের কাজ চলমান রয়েছে।
স্থানীয় জনগণের প্রত্যাশা, নতুন চিকিৎসকরা নিয়মিত উপস্থিত থেকে দিন-রাত দায়িত্ব পালন করবেন এবং রোগীদের সঙ্গে মানবিক আচরণ নিশ্চিত করবেন। একই সঙ্গে পর্যাপ্ত ওষুধ সরবরাহ, অ্যাম্বুলেন্স সুবিধা এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নিয়োগ হলে মহেশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সত্যিকার অর্থেই দ্বীপাঞ্চলের মানুষের আস্থার কেন্দ্রে পরিণত হবে বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিকরা।
স্বাস্থ্যসেবায় এই নতুন সংযোজন ঘিরে আশাবাদ যেমন বাড়ছে, তেমনি বাস্তবায়ন ও ধারাবাহিকতা নিয়েও সবার দৃষ্টি রয়েছে। এখন সময়ই বলে দেবে, নতুন এই চিকিৎসক দল কতটা সফলভাবে মহেশখালীর স্বাস্থ্যখাতে টেকসই ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।

