এম.এ.কে.রানা,মহেশখালী◾
কক্সবাজারের মহেশখালী উপকূলে বঙ্গোপসাগর থেকে জীবিত উদ্ধার হওয়া দুই শ্রীলঙ্কান জেলে তাদের প্রাণরক্ষাকারী বাংলাদেশি জেলে জিয়াউর রহমানের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে নিজেদের মাছ ধরার ফাইবার ট্রলারটি উপহার দিতে চেয়েছেন। তবে নৌকাটি বর্তমানে আদালতের জব্দ তালিকাভুক্ত থাকায় আদালতের অনুমতি ছাড়া সেটি হস্তান্তর করা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছে মহেশখালী থানা পুলিশ।
মহেশখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আবদুস সুলতান জানান, উদ্ধার হওয়ার পর দুই জেলে প্রথমে তাদের নৌকাটি নিয়ে শ্রীলঙ্কায় ফিরে যেতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। কিন্তু আইনি প্রক্রিয়ার কারণে সেটি সম্ভব নয় বলে জানানো হলে তারা উদ্ধারকারী জেলে জিয়াউর রহমানকে নৌকাটি উপহার হিসেবে দেওয়ার ইচ্ছার কথা জানান।
তিনি বলেন, “নৌকাটি আদালতে জব্দ তালিকাসহ উপস্থাপন করা হয়েছে। আদালত অনুমতি দিলে জিয়াউর রহমান আইনগতভাবে নৌকাটি গ্রহণ করতে পারবেন।”
উদ্ধারকারী জেলে জিয়াউর রহমান বলেন, তিনি কোনো পুরস্কারের আশায় তাদের উদ্ধার করেননি। তার ভাষায়, “তারা আমাকে নৌকাটি দিলেও আমি খুশি, না দিলেও খুশি। আমি শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তাদের জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করেছি। মানুষকে বাঁচাতে পেরেছি, এটাই আমার সবচেয়ে বড় পাওয়া। তারা ভালোবেসে নৌকাটি দিতে চেয়েছেন, তাই আমি সম্মান রেখেই নিতে রাজি হয়েছি।”
তিনি আরও জানান, উদ্ধার হওয়ার পর একদিন দুই শ্রীলঙ্কান জেলে তার বাড়িতেই ছিলেন। পরে পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ হলে শনিবার তাদের মহেশখালী থানায় নিয়ে যান।
পুলিশ জানায়, উদ্ধার হওয়া দুই জেলে কেবল তাদের মাতৃভাষা সিংহলি ভাষায় কথা বলতে পারেন। ফলে প্রাথমিকভাবে তাদের পরিচয় ও ঘটনার বিস্তারিত জানা সম্ভব হয়নি। পরে কক্সবাজারের একটি হোটেলে কর্মরত এক শ্রীলঙ্কান নাগরিকের সহায়তায় তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তার মাধ্যমে দুই জেলের বক্তব্য গ্রহণ করে পুলিশ এবং প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করে।
ওসি আবদুস সুলতান জানান, বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হয়। এরপর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাংলাদেশে অবস্থিত শ্রীলঙ্কার দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করে। পরে শ্রীলঙ্কার রাষ্ট্রদূত সরাসরি দুই জেলের সঙ্গে কথা বলেন এবং প্রয়োজনীয় আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে তাদের নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার আশ্বাস দেন।
পুলিশ জানিয়েছে, দুই জেলের ভ্রমণ নথি (ট্রাভেল ডকুমেন্ট) প্রস্তুতের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য, ছবি ও পরিচয়সংক্রান্ত কাগজপত্র ইতোমধ্যে শ্রীলঙ্কান দূতাবাসে পাঠানো হয়েছে। আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলে তাদের নিজ দেশে পাঠানো হবে।
মহেশখালী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) প্রতুল কুমার জানান, সোমবার আদালতের নির্দেশে সমাজসেবা অধিদপ্তরের কর্মকর্তার মাধ্যমে দুই শ্রীলঙ্কান জেলেকে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকে দূতাবাসের সহযোগিতায় পরবর্তী প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত বুধবার বঙ্গোপসাগরের সোনারচর এলাকার কাছে একটি ছোট ফাইবার ট্রলারে দুই ব্যক্তিকে ভাসমান অবস্থায় দেখতে পান স্থানীয় জেলেরা। তাদের শারীরিক অবস্থা দুর্বল ছিল এবং দীর্ঘদিন না খেয়ে থাকার কারণে তারা প্রায় মৃত্যুর মুখে ছিলেন।
পরে জিয়াউর রহমানসহ বাংলাদেশি জেলেরা তাদের উদ্ধার করে নিজেদের মাছ ধরার নৌকায় তুলে মহেশখালী নিয়ে আসেন। বৃহস্পতিবার রাত প্রায় ১০টার দিকে তারা মহেশখালী পৌঁছান।
উদ্ধার হওয়া শ্রীলঙ্কার ডেভিনুওয়ারা এলাকার বাসিন্দা এসএইচ চামিন্দা (৫১) এবং তার ছেলে সাউন্ডা হান্নাদিগি পিয়াওয়াটিং (৩০) দাবি করেছেন, তারা মাছ ধরতে গিয়ে বৈরী আবহাওয়া ও যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে দিক হারিয়ে ফেলেন।
তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, টানা ৩৬ দিন বঙ্গোপসাগরে ভেসে ছিলেন তারা। এ সময় খাবার ফুরিয়ে গেলে কাঁচা মাছ খেয়ে এবং বৃষ্টির পানি পান করেই জীবিত ছিলেন। অবশেষে বাংলাদেশের জেলেদের মানবিক সহায়তায় তারা নতুন জীবন ফিরে পান।
এই ঘটনাটি শুধু মানবিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্তই নয়, বরং সমুদ্রে বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশি জেলেদের সাহস, দায়িত্ববোধ ও উদারতারও এক অনন্য উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

