এম.এ.কে.রানা, মহেশখালী:
দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত মাতারবাড়ীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প এখন এলাকাবাসীর জন্য আশীর্বাদের বদলে দুর্ভোগের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, যানজট নিরসন এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফেরানোর লক্ষ্য নিয়ে শুরু হওয়া প্রায় ৩০ কোটি টাকার এই প্রকল্পের কাজ দশ মাস পার হলেও বাস্তবে জনজীবনে নেমে এসেছে চরম ভোগান্তি। কাজের ধীরগতি, সমন্বয়হীনতা, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ এবং যথাযথ তদারকির অভাবে স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ বিরাজ করছে।
জানা গেছে, জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা)-এর সহায়তায় মাতারবাড়ীর নতুন বাজার নিউ মার্কেট থেকে সাইরার ডেইল প্রকল্পের ২ নম্বর গেট পর্যন্ত প্রায় ৪ কিলোমিটার সড়ক সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন কাজ শুরু হয় প্রায় দশ মাস আগে। প্রকল্পের আওতায় সড়ক প্রশস্তকরণ, ড্রেন নির্মাণ, নতুন কালভার্ট নির্মাণ এবং আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
কিন্তু বাস্তবে পুরান বাজার থেকে নতুন বাজার পর্যন্ত পুরো সড়কজুড়ে খোঁড়াখুঁড়ি করে ফেলে রাখা হয়েছে। কোথাও ড্রেন খনন, কোথাও সড়ক কেটে রাখা, আবার কোথাও নির্মাণসামগ্রী স্তূপ করে রেখে কাজ বন্ধ রয়েছে। একটি অংশের কাজ শেষ না করেই অন্য অংশে খোঁড়াখুঁড়ি শুরু করায় পুরো এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এখন একটি এলাকা থেকে অন্য এলাকায় যেতে কয়েক গুণ বেশি সময় লাগছে। সিএনজি, অটোরিকশা, ইজিবাইকসহ ছোট যানবাহন চলাচল প্রায় বন্ধ। অনেক ক্ষেত্রে রোগীকে কাঁধে করে অথবা ভাঙা রাস্তা পেরিয়ে হাসপাতালে নিতে হচ্ছে। মরদেহ দাফনের জন্য নেওয়াও কষ্টসাধ্য হয়ে উঠেছে। কৃষিপণ্য, মাছ, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও নির্মাণসামগ্রী পরিবহনেও দেখা দিয়েছে চরম সংকট।
সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন শিক্ষার্থী, নারী, শিশু ও বৃদ্ধরা। ইউনিয়ন পরিষদ, বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাতায়াত করতে গিয়ে প্রতিদিনই দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। বৃষ্টি হলে কাদা এবং শুকনো মৌসুমে ধুলাবালিতে পথ চলাই যেন এক দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে।
পুরান বাজারের ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করে বলেন, প্রায় ১০ মাস ধরে ক্রেতার সংখ্যা অর্ধেকেরও নিচে নেমে এসেছে। যানবাহন প্রবেশ করতে না পারায় পাইকারি ব্যবসাও স্থবির হয়ে পড়েছে। অনেক দোকানে দিন শেষে বিক্রি কয়েকশ টাকাতেও পৌঁছায় না। কেউ কেউ কর্মচারী ছাঁটাই করেছেন, আবার অনেকে ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার কথাও ভাবছেন। অথচ তাদের এই ক্ষতির বিষয়ে কোনো ধরনের ক্ষতিপূরণ বা সহায়তার উদ্যোগ নেই।
নতুন বাজার এলাকার ব্যবসায়ীরা জানান, রাস্তার ওপর বালু, পাথর, রড ও অন্যান্য নির্মাণসামগ্রী ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখায় প্রতিনিয়ত ধুলাবালি উড়ছে। এতে শিশু ও বৃদ্ধদের মধ্যে শ্বাসকষ্ট, কাশি, চোখ জ্বালা এবং ত্বকের বিভিন্ন সমস্যা বাড়ছে। রাতে পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা, ব্যারিকেড কিংবা সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড না থাকায় প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্পের নকশা অনুযায়ী সব জায়গায় সমানভাবে সড়ক প্রশস্ত করা হচ্ছে না। কোথাও কোথাও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের স্থাপনা বা জমি রক্ষার জন্য সড়কের প্রস্থ কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া ঢালাইয়ের কাজে সড়ক খুঁড়ে তোলা নিম্নমানের বালি ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। এতে ভবিষ্যতে নির্মিত সড়কের স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘ সড়কজুড়ে একযোগে ড্রেন নির্মাণ শুরু করা হলেও প্রয়োজনীয় সংখ্যক শ্রমিক নিয়োগ দেওয়া হয়নি। হাতে গোনা কয়েকজন শ্রমিক দিয়ে বিশাল প্রকল্প বাস্তবায়নের চেষ্টা করায় কাজের অগ্রগতি অত্যন্ত ধীর। দিনের পর দিন একই অবস্থায় পড়ে থাকছে খোঁড়া রাস্তা ও অসমাপ্ত ড্রেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মূল সড়ক নির্মাণের দায়িত্বে রয়েছে প্রাণ-আরএফএল সেন্টার নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এবং ড্রেন নির্মাণ করছে সিএসআই নামে আরেকটি প্রতিষ্ঠান। স্থানীয়দের অভিযোগ, দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের অভাবে এক প্রতিষ্ঠানের কাজ অন্য প্রতিষ্ঠানের কাজে বাধা সৃষ্টি করছে। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়ন আরও বিলম্বিত হচ্ছে এবং দুর্ভোগও বাড়ছে।
এদিকে প্রকল্পের কাজের ওপর সংশ্লিষ্ট জনপ্রতিনিধি ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের কার্যকর তদারকি না থাকার অভিযোগও জোরালো হচ্ছে। স্থানীয়দের দাবি, নিয়মিত মনিটরিং থাকলে এভাবে দীর্ঘদিন ধরে সড়ক খুঁড়ে ফেলে রাখা হতো না। কিছু বাসিন্দা কমিশনের বিনিময়ে অনিয়মের বিষয়ে নীরব থাকার অভিযোগ তুললেও, এ বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, মাতারবাড়ী বর্তমানে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অঞ্চলে পরিণত হচ্ছে। গভীর সমুদ্রবন্দর, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং বিভিন্ন মেগা প্রকল্পকে ঘিরে এই এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে যদি সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে, তাহলে সেই উন্নয়নের সুফল প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
এ অবস্থায় এলাকাবাসী দ্রুত প্রকল্পের কাজের গতি বাড়ানো, নির্মাণকাজের মান যাচাই, দুই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করা, নিরাপদ চলাচলের ব্যবস্থা গ্রহণ এবং প্রকল্পে কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে তা তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য স্থানীয় প্রশাসন, সংশ্লিষ্ট দপ্তর এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তাদের আশা, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হলে দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পাবেন মাতারবাড়ীর হাজারো মানুষ।

