এম.এ.কে. রানা, মহেশখালী:
টানা কয়েক দিনের অতিবর্ষণ ও অস্বাভাবিক জোয়ারের প্রভাবে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়ী ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। বিশেষ করে ষাইটপাড়া, সাইরার ডেইলের জালিয়াপাড়া, বাহিরপাড়া, নিম্নাঞ্চলসহ বিভিন্ন গ্রামে শত শত পরিবার পানিবন্দী হয়ে চরম দুর্ভোগে দিন কাটাচ্ছে। অনেকের ঘরবাড়িতে কোমরসমান পানি জমে থাকায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা সম্পূর্ণভাবে ব্যাহত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে ত্রাণ ও মানবিক সহায়তা কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে মহেশখালী উপজেলা প্রশাসন।

বুধবার (৮ জুলাই) দুপুরে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার বিভিন্ন পরিবারের হাতে শুকনো খাবারসহ জরুরি খাদ্যসামগ্রী তুলে দেওয়া হয়। ত্রাণ বিতরণের পাশাপাশি প্রশাসনের কর্মকর্তারা দুর্গত এলাকার বিভিন্ন বাড়িতে গিয়ে সরেজমিনে ক্ষয়ক্ষতির চিত্র পরিদর্শন করেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের খোঁজখবর নেন। এ সময় তারা স্থানীয়দের সমস্যা ও প্রয়োজনীয়তার কথা শুনে দ্রুত সহায়তার আশ্বাস দেন।

ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রমে উপস্থিত ছিলেন মহেশখালীর সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. আবু জাফর মজুমদার এবং উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা সৌভ্রাত দাশ। এছাড়াও স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, স্বেচ্ছাসেবক, গ্রাম পুলিশ ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা ত্রাণ বিতরণে সহযোগিতা করেন।

স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কয়েক দিনের টানা বর্ষণ ও জোয়ারের পানির চাপে জালিয়াপাড়া এলাকার কয়েকটি বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। অনেক পরিবারের রান্নাঘর, শয়নকক্ষ ও উঠান পানিতে তলিয়ে থাকায় তারা নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন।খাদ্যসামগ্রী, কাপড়চোপড়, আসবাবপত্র এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পানিতে নষ্ট হয়ে গেছে। গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি নিয়ে বিপাকে পড়েছেন অনেক পরিবার।
এছাড়া বিভিন্ন সড়ক, গ্রামীণ রাস্তা ও চলাচলের পথ পানির নিচে চলে যাওয়ায় মানুষের স্বাভাবিক যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। কোথাও কোথাও নৌকা ছাড়া চলাচলের কোনো উপায় নেই। কর্মজীবী মানুষ কাজে যেতে না পারায় অনেক পরিবার আয়-রোজগারহীন হয়ে পড়েছে। শিশুদের শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে এবং অসুস্থ রোগীদের হাসপাতালে নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে।
স্থানীয়রা জানান, দীর্ঘ সময় ধরে পানি জমে থাকায় বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। অধিকাংশ নলকূপ পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় নিরাপদ পানীয় পানি সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে ডায়রিয়া, চর্মরোগসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। দ্রুত চিকিৎসা সহায়তা ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন দুর্গতরা।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইমরান মাহমুদ ডালিম বলেন, “দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত কোনো পরিবারকে একা ফেলে রাখা হবে না। সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মাঝে পর্যায়ক্রমে ত্রাণ ও মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত উপজেলা প্রশাসনের ত্রাণ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি। কোথাও নতুন করে জলাবদ্ধতা, নদীভাঙন বা অন্য কোনো জরুরি পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র নিরূপণে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো মাঠপর্যায়ে কাজ করছে। প্রয়োজন অনুযায়ী আরও ত্রাণ বরাদ্দের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হয়েছে।”
ত্রাণ সহায়তা পেয়ে উপকারভোগীরা উপজেলা প্রশাসনের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেও তারা জানান, কেবল একদিনের সহায়তায় সংকট কাটবে না। পানি পুরোপুরি নেমে না যাওয়া পর্যন্ত নিয়মিত খাদ্য সহায়তা, বিশুদ্ধ পানি, শিশু খাদ্য, ওষুধ ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন এবং ঘরবাড়ি মেরামতের জন্য বিশেষ সরকারি সহায়তা প্রয়োজন।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, জলাবদ্ধতা নিরসনে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ, পানি নিষ্কাশনের প্রাকৃতিক পথ সচল রাখা, খাল ও ড্রেন নিয়মিত খনন এবং নিচু এলাকার টেকসই অবকাঠামো নির্মাণ করা না হলে প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে মাতারবাড়ীর মানুষকে একই ধরনের দুর্ভোগের মুখোমুখি হতে হবে।

