এম.এ.কে.রানা, মাতারবাড়ী (মহেশখালী)◾
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব দিন দিন ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে বাংলাদেশের উপকূলীয় জনপদগুলোতে। এর অন্যতম নির্মম উদাহরণ কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়ী ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সাইরার ডেইল এলাকার জালিয়া পাড়া ও বাহির পাড়া। একসময় বঙ্গোপসাগরের মাছ শিকারকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা শান্ত, সমৃদ্ধ ও জনবহুল এই উপকূলীয় গ্রামটি এখন পরিণত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের এক জীবন্ত ট্র্যাজেডিতে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, অস্বাভাবিক জোয়ার, ঘূর্ণিঝড় এবং অব্যাহত উপকূল ভাঙনে প্রতিদিনই হারিয়ে যাচ্ছে মানুষের বাপ-দাদার ভিটেমাটি। গৃহহীন হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন হাজারো মানুষ। স্থানীয়দের ভাষায়, “সমুদ্র শুধু জমি নয়, মানুষের স্মৃতি, ইতিহাস আর ভবিষ্যৎও গিলে খাচ্ছে।”

সম্প্রতি সরেজমিনে সাইরার ডেইল এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, পুরো এলাকায় বিরাজ করছে আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তা। যেখানে কয়েক বছর আগেও ছিল অসংখ্য বসতবাড়ি, সেখানে এখন শুধু উত্তাল ঢেউ আর ভাঙনের চিহ্ন। সমুদ্রের প্রতিটি জোয়ার যেন আরও কয়েক হাত জমি কেড়ে নিচ্ছে। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে দুই থেকে তিনবার পর্যন্ত নিজেদের ঘর সরিয়েছে। কিন্তু এখন আর সরানোর মতো নিরাপদ জায়গাও নেই।

স্থানীয়রা জানান, আগে ভাঙন ছিল মৌসুমি। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে প্রায় সারা বছরই ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। পূর্ণিমা ও অমাবস্যার জোয়ার এলেই আতঙ্কে রাত কাটাতে হয়। সামান্য দুর্যোগেই সমুদ্রের পানি ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ে। এতে বসতঘর, রান্নাঘর, টয়লেট, মাছ শুকানোর স্থান, গাছপালা ও কৃষিজমি একের পর এক বিলীন হয়ে যাচ্ছে।

ভুক্তভোগী আব্দুল করিম বলেন, “আমার বাপ-দাদার ভিটা এখন সমুদ্রের পেটে। তিনবার ঘর সরিয়েছি। এখন আর সরানোর মতো জমি নেই। টাকা-পয়সাও শেষ। আমরা কোথায় যাব, কীভাবে বাঁচব—সেটা কেউ ভাবছে না।”

আরেক বাসিন্দা রহিমা বেগম বলেন, “রাতে জোয়ার এলেই ঘুমাতে পারি না। কখন ঘর ভেঙে যায়, সেই ভয় নিয়ে থাকি। সন্তানদের নিয়ে খুব কষ্টে জীবন কাটছে।”

স্থানীয়দের দাবি, মাতারবাড়ীতে বাস্তবায়িত বিভিন্ন বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্প, বিশেষ করে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও গভীর সমুদ্রবন্দর সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের ফলে উপকূলীয় এলাকার স্বাভাবিক ভৌগোলিক ও জলপ্রবাহ ব্যবস্থায় পরিবর্তন এসেছে। এর প্রভাব সাইরার ডেইল উপকূলে আরও বেশি অনুভূত হচ্ছে বলে তাদের অভিযোগ। যদিও বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিস্তারিত বৈজ্ঞানিক মূল্যায়নের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।

এলাকাবাসী জানান, ভাঙন রোধে মাঝে মাঝে জিওব্যাগ ফেলা হলেও তা কয়েক দিনের মধ্যেই সাগরের ঢেউয়ে সরে যায় বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে কোটি কোটি টাকার সম্পদ ও মানুষের জীবন-জীবিকা রক্ষায় এসব উদ্যোগ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না।

স্থানীয় ইউপি সদস্য মোহাম্মদ আলী জানান, সাইরার ডেইলে ইতোমধ্যে শত শত পরিবার তাদের বসতভিটা হারিয়েছে। অনেকেই আত্মীয়-স্বজনের আশ্রয়ে কিংবা অন্যত্র ভাড়া বাসায় বসবাস করছেন। অনেকে আবার খোলা আকাশের নিচে কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে অস্থায়ীভাবে ঘর তুলে বসবাস করছেন। প্রতিদিনই নতুন নতুন পরিবার বাস্তুচ্যুত হচ্ছে।

পরিবেশকর্মী আবু বক্কর ছিদ্দিক জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, অস্বাভাবিক জলোচ্ছ্বাস এবং উপকূল ক্ষয়ের হার ভবিষ্যতে আরও বাড়বে। তাই শুধু জিওব্যাগ ফেলে এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। প্রয়োজন আধুনিক ও টেকসই উপকূল রক্ষা বাঁধ, বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনায় ভাঙন প্রতিরোধ প্রকল্প, উপকূল ব্যবস্থাপনার দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর স্থায়ী পুনর্বাসনের দাবী জানান।

মাতারবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এস.এম. আবু হায়দার জানান, বিষয়টি একাধিকবার প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে অবহিত করা হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান ও কার্যকর কোনো স্থায়ী উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে সাইরার ডেইলের আরও বড় অংশ সমুদ্রগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এদিকে, জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় শিকার হয়েও এই উপকূলবাসীরা এখনও পর্যাপ্ত সরকারি সহায়তা ও পুনর্বাসনের অপেক্ষায় দিন গুনছেন। তাদের দাবি, শুধু ত্রাণ নয়, নিরাপদ আবাসন, টেকসই বেড়িবাঁধ, বিকল্প জীবিকার সুযোগ এবং দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন পরিকল্পনাই পারে তাদের বাঁচাতে।

উপকূলের এই জনপদ আজ শুধু একটি গ্রামের সংকট নয়; এটি জলবায়ু পরিবর্তনের মুখে বাংলাদেশের ভবিষ্যতের এক কঠিন বাস্তবতা। সাইরার ডেইলের মানুষের শেষ আশ্রয়টুকু রক্ষায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে আগামী দিনে আরও হাজারো পরিবার জলবায়ু উদ্বাস্তুতে পরিণত হবে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

