এ.আর. রিটন, মাতারবাড়ী◾
কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়ি ইউনিয়নে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ এবং জলবায়ু পরিবর্তন ও উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের দাবিতে বিশাল মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
রোববার (১৯ জুলাই) বিকেল ৩টায় মাতারবাড়ির সাইরারডেইল সংলগ্ন জালিয়াপাড়া প্রধান সড়কে স্থানীয় সর্বস্তরের জনগণের উদ্যোগে এ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। এতে জালিয়াপাড়া, সাইটপাড়া ও বাহিরপাড়াসহ উপকূলীয় এলাকার শত শত ভুক্তভোগী পরিবার, মৎস্যজীবী, লবণ চাষি, সামাজিক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা ব্যানার হাতে অংশ নেন।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, মাতারবাড়িতে বাস্তবায়নাধীন বিভিন্ন মেগা উন্নয়ন প্রকল্প দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও এর বিরূপ প্রভাব বহন করতে হচ্ছে স্থানীয় বাসিন্দাদের। উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য বালি ভরাট, উপকূলীয় ভাঙন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে জালিয়াপাড়া, সাইটপাড়া ও বাহিরপাড়া এলাকার শত শত পরিবার ভিটেমাটি হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। তাদের দাবি, ইতোমধ্যে জালিয়াপাড়া ও সাইটপাড়ার প্রায় চার শতাধিক ঘরবাড়ি সাগরে বিলীন হয়ে গেছে।
মানববন্ধন থেকে বক্তারা অবিলম্বে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর স্থায়ী ও টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের দাবি জানান। তারা বলেন, জোয়ারের পানি, সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস ও উপকূলীয় ভাঙন থেকে মাতারবাড়িকে রক্ষা করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ভিত্তিতে বেড়িবাঁধ নির্মাণের কোনো বিকল্প নেই।
একই সঙ্গে উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে ভাঙনের শিকার হয়ে গৃহহীন হয়ে পড়া পরিবারগুলোর জন্য সরকারি উদ্যোগে দ্রুত স্থায়ী আবাসন ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানান বক্তারা।
স্থানীয় রাজনীতিবিদ হামেদ হোছাইন খোকা বলেন, “আজকের মানববন্ধন কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়, এটি উপকূলের মানুষের বাঁচার আন্দোলন। আমাদের দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।”
স্থানীয় বাসিন্দা আলী আজগর বলেন, “আমরা উন্নয়নের বিরোধী নই। কিন্তু আমাদের ভিটেমাটি ও জীবন বিপন্ন করে এই উন্নয়ন আমাদের জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জালিয়াপাড়া আজ প্রায় বিলীন। আমরা দ্রুত টেকসই বেড়িবাঁধ এবং মাথা গোঁজার একটি স্থায়ী আশ্রয় চাই।”
জালিয়াপাড়া এলাকার প্রবীণ বাসিন্দা মাওলানা আবদুল মালেক বলেন, “প্রতি বছর বর্ষা ও জোয়ার এলেই আতঙ্কে থাকতে হয়। একসময় যেখানে আমাদের বাড়িঘর ছিল, আজ সেখানে শুধু সাগরের পানি। আমরা আর কোনো আশ্বাস চাই না, স্থায়ী সমাধান চাই।”
স্থানীয় মফিজুর রহমান বলেন, “সমুদ্রের ভাঙনে আমরা যেমন বসতভিটা হারিয়েছি, তেমনি জীবিকাও হুমকির মুখে পড়েছে। টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ হলে মানুষ যেমন নিরাপদ থাকবে, তেমনি উপকূলের অর্থনীতিও রক্ষা পাবে।”
বাদশা মিয়া বাড়ু বলেন, “জলোচ্ছ্বাস ও লবণাক্ত পানির কারণে আমাদের চাষাবাদ ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বেড়িবাঁধ না থাকলে আগামী দিনে এ এলাকায় বসবাস করাই কঠিন হয়ে যাবে।”
স্থানীয় যুবক সাজেদুল ইসলাম তোফায়েল বলেন, “উন্নয়নের সুফল আমরা চাই, কিন্তু সেই উন্নয়নের কারণে যদি মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়ে, তাহলে তাদের পুনর্বাসনের দায়িত্বও রাষ্ট্রকে নিতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য দ্রুত আবাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।”
সমাবেশে একাধিক ভুক্তভোগী অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন ধরে নানা আশ্বাস দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত কোনো স্থায়ী ও কার্যকর উদ্যোগ চোখে পড়েনি। তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, দ্রুত বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও বাস্তুচ্যুতদের পুনর্বাসনের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হলে স্থানীয় জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আরও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
মানববন্ধন শেষে বর্তমান সরকারের প্রধান মন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়, কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক এবং কক্সবাজার-২ (মহেশখালী-কুতুবদিয়া) আসনের সংসদ সদস্য আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ ফরিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।

